Deman Tripura

পলিটিক্যাল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং

সেলস ও মার্কেটিং ধারণাটি সাধারণত ব্যবসায়ীদের ফ্রেমেই আলোচিত হয়। এটিকে সাময়িকের জন্য বাংলায় আমার মতো করে দাঁড় করালে বলা যায়: দরকষাকষি ও আদর্শের  উপস্থাপন। এই টার্মটি শুধু ব্যবসায় নয়; চাকরি, ঘুষ, ক্যারিয়ার, রাজনীতি এমনকি মেধা বিনিয়োগ: সব ক্ষেত্রেই এই "দরকষাকষি ও আদর্শের  উপস্থাপন" টার্মটি  কার্যকর।

এই “দরকষাকষি ও আদর্শের  উপস্থাপন”-এর নীতি কেবল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নীতিমালা, প্রিন্সিপাল পলিসি এমনকি সংবিধান পর্যায়েও সক্রিয় । একেকজন একেক আঙ্গিকে এই দরকষাকষি ও আদর্শের  উপস্থাপনগুলো  করে থাকে। ফলে রাজনীতিকে যদি আমরা আদর্শের বাইরে এনে বিশ্লেষণ করি, তাহলে এটি এক ধরনের Political Marketplace হিসেবে ধরা দেয়, যেখানে ধারণা, নীতি, ভয়, আশা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ: সবই বিক্রয়যোগ্য পণ্য।

সব ধরনের হেজেমনি ও ফেনোমেনন বাদ দিয়ে যদি ইংরেজি “Sales and Marketing” শব্দটিকে দেশের রাজনীতির সাথে মুড়িয়ে  বিশ্লেষণ করি, তাহলে যে সম্ভাব্য বিষয়গুলো উন্মোচিত হয়, তা হলো-
আমাদের দেশে বৈচিত্র্যময় আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। প্রত্যেক দলই মনে করে তারাই সেরা। তাদের আদর্শ এতটাই উন্নত যে কেবল বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞানীরাই তা বুঝতে পারে; সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে না বলেই তারা সমাজে প্রবেশাধিকার (access) পাচ্ছে না।
এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তারা সাধারণত তিনটি বিষয়কে দায়ী করে-
আর্থিক সমস্যা
জনগণের সচেতনতার অভাব
সরকারের সদিচ্ছার অভাব
তাদের দাবি: আদর্শগত বা জ্ঞানগত কোনো ঘাটতি নেই। ফলে তারা সারাবছর নিজেদের আদর্শ চর্চা করে। সামনে যা-ই ঘটুক, সেটিকে তারা একই আদর্শিক ফ্রেমে ব্যাখ্যা করে, বিশ্লেষণ করে, উপস্থাপন করে।
নৃবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় approach বা perspective। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি একবার যদি একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যামূলক ফ্রেম অর্জন করে ফেলে, সে আর সেখান থেকে বের হতে চায় না। সে সব ঘটনা সেই একই ফ্রেমের ভেতর দিয়েই দেখে ও পর্যবেক্ষণ করে।
গ্রামসির ভাষায় এখানেই কাজ করে "হেজেমনি"; যেখানে মানুষ মনে করে সে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অথচ সে আসলে একটি পূর্বনির্ধারিত ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরেই সম্মতি দিচ্ছে।


  প্রতীকি ফটো (এআই)

রাজনীতিতে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিংকে  পুঁজি করে যারা রাজনীতিতে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং করে (অবশ্যই প্রফেসর ইউনূস এটিকে “Social Business”-এর ভেতর দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, তবে আমি এটিকে সেলস ও মার্কেটিংয়ের দৃষ্টিতে আলোচনা করছি)
কারণ তাদের প্রধান প্রয়োজন: টাকা ও ক্ষমতা। এই টাকা ও ক্ষমতাকেই পুঁজি করে তারা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে। আবার এই ন্যায়বিচার ও কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমেই তারা নতুন করে টাকা ও ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে একটি চক্র (circle) তৈরি হয় অটোমেটিক্যালী।
এই চক্র একবার যে রপ্ত করতে পারে, সে এটিকে অত্যন্ত কার্যকর ও লাভজনক প্রক্রিয়া হিসেবে ধারণ করে, লালন করে এবং পালন করে। এই ধরনের রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সমতল, দেশে সব জায়গাতেই চলে।
যেমন- দেশে যত রোগ বাড়ে, তত ডাক্তার, ফার্মেসি ও ওষুধ কোম্পানি খুশি হয়; কারণ তাদের সেলস বাড়ে। ঠিক তেমনি রাজনীতিতে যত আইনভঙ্গ ও অপরাধ বাড়ে, তত রাজনীতিবিদরা খুশি হয়। কারণ এতে ন্যায়বিচারের নামে তাদের সেলস টার্গেট পূরণ হয়।
সমাজ যখন রোগমুক্ত হতে শুরু করে, তখন ওষুধ কোম্পানিগুলো নতুন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার গবেষণায় বিনিয়োগ করে। একইভাবে রাজনীতিবিদরাও সমাজে নানান কৃত্রিম অসংগতি তৈরি করে, তারপর সেই অসংগতির সমাধানের নামে নীতি, আইন ও ন্যায়বিচার উপস্থাপন করে নিজেদের সেলস ও মার্কেটিং বাড়ায়।
উদাহরণস্বরুপ:
কারও পকেটে মাদক, অবৈধ জিনিস ঢুকিয়ে ফাঁসানো,
নারী দিয়ে ফাঁদ পেতে টাকা আদায়,
কারও কাছে অবৈধ কোটি টাকা থাকার তথ্য জেনে ভাগ-বণ্টনের জন্য চাপ প্রয়োগ।
আবার অন্যদিকে-
একদল রাজনীতিবিদ অবৈধ টাকা নিজের খরচে ব্যবহারের পাশাপাশি সমাজকল্যাণে ব্যয় করার জন্য চাপ দেয়, প্রয়োজনে ব্যাক্তিকে  অপহরণ করে অর্থ আদায় করে,
আবার কেউ কেউ নির্বাচনকেন্দ্রীক  অবৈধ টাকা অর্জনগুলো  দল, সংগঠন ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালায়।
এই অবৈধ টাকাগুলো হুট করে খরচ না করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ধীরে ধীরে ব্যয় করা হয়। যদিও এটি “মন্দের ভালো”, তবুও বাস্তবতা হলো: এইভাবেই রাজনীতি চলছে দেশে। আর অবৈধ এই টাকাগুলো একমাত্র  পলিটিশিয়ানরা জানে......! এই পলিটিশিয়ান নলেজ: পুলিশ, প্রশাসন, অপরাধী,  পলিটিশিয়ান যেকোন ব্যাক্তির মাঝে  ধারনাটি গড়ে উঠতে পার.....।
এই সেলস ও মার্কেটিং ধারণাটিকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় দেশের চলমান নির্বাচনী নানা কলাকৌশল বিশ্লেষণ করলে।
এই দেশে নির্বাচন;   কারো কাছে টাকা,কারো কাছে ক্ষমতা,কারো কাছে গণতন্ত্র,কারো কাছে উৎসব,কারো কাছে আলাপ–আলোচনা,আবার কারো কাছে নিছক ছলচাতুরী ও কলাকৌশলের নাম।
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ব্যক্তি, সমাজ ও দল বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নানা পথরেখা তৈরি করে নেয়। কেউ দল থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়, কারণ সে জানে দলের ভোটব্যাংক আগেই রেডি বা রিজার্ভ আছে। কিন্তু দল বা সংগঠনকে অপছন্দ করে: এমন ভোটারদের টানতে হলে নিজেকে “দলের বাইরে” উপস্থাপন করতে হয়। প্রয়োজনে সাময়িক বহিষ্কারের নাটকও মঞ্চস্থ করা হয়।
আবার প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলার জন্য প্রতিপক্ষ দলের কাউকে মনোনয়ন সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার বা বয়কট করানো হয়। কখনো পুরো নির্বাচনকেই “অপ্রাসঙ্গিক” বা “অবৈধ” ট্যাগ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
কখনো চার-পাঁচজনকে নিজের অপোনেন্ট সাজিয়ে ( কৃত্রিম বিরোধী  সাজিয়ে)  মাঠে নামানো হয় মনোনয়ন সংগ্রহ করতে দিয়ে বা নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে, যাতে দিনশেষে  নিজের ভোটের ওজন ভারী করা যায়। আবার কখনো তথাকথিত নির্বাচনী সমঝোতার নামে বিভিন্ন দল একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
এই সব মিলেই নির্বাচন হয়ে ওঠে ক্ষমতার দরকষাকষির সবচেয়ে বড় বাজার।

মিশেল ফুকোর মতে ক্ষমতা কেবল দমন করে না; ক্ষমতা অপরাধ, বৈধতা ও সত্যও উৎপাদন করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চারটি বিষয় প্রায় স্থায়ীভাবে সবসময় বিরাজ করে হলো:
অবৈধ, অপরাধ, গুপ্তচরবৃত্তি ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম।
এই চারটি কাজই করতে পারে: পুলিশ প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী,আন্ডারগ্রাউন্ডের মানুষ, এমনকি সরকারের চোখে অপরাধী ব্যক্তিরাও।
তখন প্রশ্ন আর থাকে না; কে অপরাধী? প্রশ্ন দাঁড়ায়-কোন ক্ষমতা কোন কাজকে অপরাধ বা কল্যাণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে?

যেভাবে রোগ বাড়লে ওষুধ কোম্পানির সেলস বাড়ে, ঠিক তেমনি সমাজে আইনভঙ্গ ও অসংগতি যত বাড়ে, রাজনীতির সেলস টার্গেট তত পূরণ হয়। সমাজ যখন স্থিতিশীল হতে শুরু করে, তখন নতুন কৃত্রিম সংকট, বিভাজন ও ভয় তৈরি করা হয় যাতে আবার ন্যায়বিচার ও সংস্কারের বাজার খোলা যায়।

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার  দৃষ্টিতে রাজনীতি শুধু  সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি পারফরম্যান্স। নির্বাচন মানে এখানে অভিনয়, নাটক, সংকেত, দৃশ্যমানতা ও আবেগের উপস্থাপন।
ভোটার এখানে শুধু নাগরিক নয়, সে দর্শকও। আর রাজনীতিবিদ হলো পারফর্মার, যে জানে কখন কীভাবে কাকে কী দেখাতে হবে।

আর গ্রামসি দেখান: কীভাবে সম্মতি তৈরি হয়,ফুকো দেখান কীভাবে অপরাধ ও বৈধতা উৎপাদিত হয়,আর নৃবিজ্ঞান দেখায় কীভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি পারফরম্যান্সে রূপ নেয়।
এই তিনটি মিলেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের পলিটিক্যাল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং। যেখানে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে আদর্শের জায়গা থেকে সরে গিয়ে টাকা ও ক্ষমতার দরকষাকষিতে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়: কোথায় কতখানি অবৈধ?কোথায় কতখানি অপরাধ?কোথায় কতখানি গুপ্তচরবৃত্তি? আর ঠিক কোন অংশটুকু সত্যিই কল্যাণমূলক?
এই অস্পষ্ট সীমারেখার মধ্য দিয়েই রাজনীতির সেলস ও মার্কেটিং অবিরাম চলতে থাকে....।


ধীমান ত্রিপুরা
বি.এস.এস (অনার্স), এম.এস.এস (নৃবিজ্ঞান) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Post a Comment

0 Comments